বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল

আদিকাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। এ দেশের জমিজমা, ফসলাদি সবকিছুই কৃষির নিদর্শন বহন করে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৬ শতাংশ গ্রামে বাস করে। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। দেশের মোট জমির প্রায় ৬০ ভাগই কৃষিজমি। আবহাওয়া পুরাপুরি কৃষি উপযোগী হওয়ায় সারাবছর বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। তা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।

২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে (গ্রোস ডমেস্টিক প্রডাক্ট) ১৩.৪৭ শতাংশ অবদান রেখেছে কৃষিখাত। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী মোট জনশক্তির ৪০.৬২ শতাংশ এখনো কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। দেশে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। মাথাপিছু হিসেবে যা ০.৪৪ শতাংশ। তাই বলা যায়, দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড কৃষি।

কৃষিখাতে উৎপাদন হয় নানান রকমের পণ্য। তা দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:

  1. অর্থকরী শস্য (Cash Crop) এবং
  2. খাদ্য শস্য (Food Crop)

এ আর্টিকেলে অর্থকরী ফসল নিয়ে আলোচনা করবো৷

অর্থকরী ফসল বলতে আমরা বুঝি, যে ফসলগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে আবাদ করা হয়। মূলত যারা উৎপাদক তারা অন্যের জন্যই ফসল উৎপাদন করে। তা রপ্তানি করে আয় হয় বৈদেশিক মুদ্রা। এসব ফসলকে কেন্দ্র করে উঠানামা করে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার দর। এ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে সচল থাকে দেশের অর্থনীতি।

বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল:

  • পাট
  • চা
  • তামাক
  • তুলা
  • রাবার
  • সিল্ক
  • কফি
  • পান
  • সুপারি এবং
  • বিভিন্ন ধরনের মসলা সহ আরও অনেক কিছু।

পাট:

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাট চাষে খুবই উপযোগী। প্রায় তিন হাজার বছর আগে শুরু হয় পাট চাষ। ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় দেশের প্রধান অর্থকরী ফসলের স্থান। পাট উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও কাঁচা পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম। মানের দিক থেকে দেশের পাট ও পাটপণ্য বিশ্বসেরা। ২৭ মার্চ ২০২১ সালে ‘প্রথম আলো’ অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ সূত্র অনুসারে, পৃথিবীতে মোট উৎপাদিত পাটের ৪২ শতাংশ হয় বাংলাদেশে৷ পাট থেকে ২৮৫ ধরনের পণ্য উৎপাদন হয় দেশে। তা রপ্তানি হয় বিদেশেও। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এর তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ আয় করে ১০ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ডলার৷

পাট কেবল অর্থনীতিতেই ভূমিকা রাখছে তা নয়, শিল্প ও বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে৷ এক সময় কেবল পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। স্বাধীনতার প্রথম বছর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ৮৪ শতাংশ এসেছিল পাট থেকে। দৈনন্দিন জীবন ও জাতীয় অর্থনীতিতে পাটের অবদানের কারণে জাতীয় প্রতীকে ঠাই পেয়েছে পাটপাতা।

পাটের পাতা যেমন শাক হিসেবে খাওয়া যায় তেমনি খাওয়া যায় গ্রীন টি হিসেবেও। সেই সাথে জমিতে পরে থাকলে কাজ করে জৈব সার হিসেবে। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় পাঠ কাঠি। আবার এ কাঠি থেকেই তৈরি হয় চারকোল বা ছাই, যা রপ্তানিও হয়। এছাড়াও পাট কাঠি থেকে তৈরি হয় কার্বন পেপার, ফটোকপি মেশিনের কালি, মোবাইলের ব্যাটারি, পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট, মুখমন্ডল পরিষ্কারক (ফেস ওয়াশ) সহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী ।

ফোর্ট ও টয়োটা কোম্পানির ভারি কার্পেট ও আসন তৈরিতে ব্যবহার করা হয় পাট। বিএমডাব্লিউ গাড়ির ভেতরের বক্স সহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত গাড়ির দরজা তৈরির কাচামাল হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করেছে পাট৷ এসবের কাঁচামালের যোগান দিতে যে পাট ব্যবহার হয় তার বেশিভাগই বাংলাদেশের রপ্তানি। এসব কারণে পাট যে কেবল আমাদের সোনালি আঁশ তা নয়, পাট আমাদের রূপালি কাঠিও৷

এছাড়াও পাটের আঁশ থেকে প্রাপ্ত সুতা দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি, ব্যাগ, কাঁথা, পাপুস, স্যান্ডেল, ছিকা, ম্যাট, দোলনা, শোপিস, ওয়ালম্যাট সহ তৈরি হয় বহুকিছু, যা পাটকে করেছে অনন্য অর্থকরী ফসল। পাট দেশের চাহিদা মিটয়ে আয় করে বৈদেশিক মুদ্রা এবং শক্তিশালী করছে আমাদের অর্থনীতি।

চা:

উষ্ণ পানীয় পিপাসু মানুষরাই বোঝে চায়ের কদর। বিশ্বব্যাপী চায়ের জনপ্রিয়তা বহু যুগ ধরেই চলছে। চা আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল৷ এটি কেবল রপ্তানিমুখী পণ্যই নয় বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী একটি খাতও।

দেশে চা উৎপাদনের প্রায় ৫৫ ভাগ মৌলভীবাজার, ২২ ভাগ হবিগঞ্জ, উত্তরবঙ্গে ১০ ভাগ, সিলেটে ৭ ভাগ, চট্টগ্রামে ৬ ভাগ সহ অন্যান্য জেলায় ৪ ভাগের মতো হয়। সাধারণত যেখানে পানি জমে না সেখানেই চাষ হয় চা। এ কারণে পাহাড়ি এলাকা চা চাষে বিশেষ উপযোগী। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে সমতল ভূমিতেও চাষ হচ্ছে চা। দেশের চাহিদা পূরণ করে আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রতিবছর বাড়ছে চায়ের উৎপাদন। ১৬৭ টি বাগান থেকে ২০২০ সালে উৎপাদন হয়েছে ৮ কোটি ৬৩ লাখ কেজি চা এবং ২০২১ সালে তা উন্নতি হয় ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজিতে। ১৬৮ বছরের চায়ের ইতিহাসে এটিই ছিলো সর্বোচ্চ ফলন। স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ছে চা রপ্তানি তথা বৈদেশিক মুদ্রা এবং কর্মসংস্থান।

তামাক:

বহুবিধ (বিস্তর) তর্কবিতর্ক থাকলেও তামাক দেশের অন্যতম একটি অর্থকরী ফসল। বিশ্বে তামাকজাত পণ্য ব্যবহারে বাংলাদেশ অন্যতম। এটা একদম ভালো দিক নয়। তামাক একটি সস্তা পণ্য। এটি একটি বিতর্কিত পণ্য হওয়ার পরও দাম না-বাড়াতে সরকারের সাথে দেনদরবার করে উৎপাদনকারীরা। তারা জানে, দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে ব্যবহারকারী৷

তামাক উৎপাদনে বাংলাদেশ এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, চাহিদা মেটাতে যত ধরনের তামাক পাতা দরকার, সবগুলোই উৎপাদন হয় দেশে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৯৭ একর জমিতে চাষ হয় তামাক। যার বেশিভাগই চাষ হয় রংপুর ও কুষ্টিয়া জেলায়।

দেশে উচ্চহারে করদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তামাক দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শীর্ষে। তামাকজাত পণ্য থেকে আদায় হওয়া রাজস্ব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে৷

তামাক চাষে ব্যাহত হয় অন্যান্য ফসলের উৎপাদন। এটি মাটি ও চাষিদের অনেক ক্ষতি করে। পাতা উত্তোলন/সংগ্রহের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শরীর আঠালো, কালো বা নীল হয়ে যায়। যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এত অসুবিধার পরও উৎপাদন খরচ অল্প আর তামাকজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সহজলভ্যতায় থেমে নেই তামাক চাষ।

তবে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ইদানীং তামাকের পরিবর্তে বাড়ছে ডাল ও সূর্যমুখী ফুলের চাষ। রংপুর জেলার যেসব উপজেলায় ছিল তামাকের চাষের দখলে ২০১৮ এর পর থেকে সেখানে বাড়ছে সূর্যমুখীর চাষ। তাই ধীরে ধীরে অর্থকরী ফসলের অন্তর্গত হচ্ছে সূর্যমুখী, বাড়ছে এই তেলের চাহিদা ও ব্যবহার। যা স্বাস্থ্য উপকারিতায় তামাকের ঠিক বিপরীত। সূর্যমুখীর ব্র্যান্ডিং আর উৎপাদন বাড়াতে পারলে স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা। এতে আরও দ্রুত সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।

তুলা:

বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের সুনাম ও জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপী। যুগ যুগ ধরে তৈরি হচ্ছে সেরা মানের বস্ত্র। তাঁতের তৈরি বস্ত্র রপ্তানি হয়েছে বহুকাল আগে। গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে বহির্বিশ্বে যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।

বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচা মাল তুলা। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না দেশে তুলার চাহিদা কতটা ব্যাপক। সেই তুলনায় খুব সামান্য পরিমাণ তুলা উৎপাদন হয় দেশে। তুলা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৪০ তম।

প্রায় ৭০০০ বছর আগে পৃথিবীতে তুলা চাষ শুরু হয়৷ ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে কার্পাসের চাষ হতো। তাই ঘরে ঘরে চরকার সাহায্যে কাটা হতো সুতা, বুনা হতো কাপড়। তৎকালীন সময় মসলিন সহ অন্যান্য বস্ত্র রপ্তানি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। আমাদের কাপড়ের সাথে পেরে উঠতো না ম্যানচেস্টারের কাপড় তাই ইংল্যান্ডে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বঙ্গের তাঁত বস্ত্র।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ তুলা চাষ ধ্বংস করা হয়েছিল ইংরেজ শাসনামলে। সে সময় ইংল্যান্ডের কারখানার কাঁচামালের চাহিদা পূরণ করতে বঙ্গী কৃষকদের বাধ্য করা হয়েছিল নীল চাষে। এভাবে আমাদের অর্থকরী ফসলের তালিকা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে তুলা। দেশ স্বাধীনের পর তুলা চালের অবস্থা অনেক পরিবর্তন হলেও আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি এখনও।

তুলা আমদানি কারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশের ৩৮৩ টি সুতা-কলের চাহিদা পূরণ করতে সিংহভাগ তুলা আমদানি করা হয় আফ্রিকা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে। তবে আমদানি নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড৷ তুলাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর গবেষণা, সংরক্ষণ ও উন্নত তুলা চাষ প্রসার ঘটাতে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে চাহিদার অন্তত ২০ ভাগ পূরণ করতে চায় দেশে উৎপাদিত তুলা দিয়ে। তারই ধারাবাহিতকায় যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, খুলনা, ঢাকা, টাঙ্গাইল এবং ময়মনসিংহের বেশ কিছু অঞ্চলে তুলার চাষ হচ্ছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৭ লক্ষ বেল তুলা উৎপাদিত হয়েছে৷ বর্তমানে আমাদের জিডিপির ১১.১৬ শতাংশ যোগান দেয় বস্ত্রখাত। তুলা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখছে৷

সুতার কলের কাঁচা মাল হিসেবে তুলার মূল ব্যবহার হলেও তুলার বর্জ্য দিয়ে লেপ তোশক, শতরঞ্জি সহ অনেক কিছুই তৈরি হয়। এছাড়াও তুলার বীজ থেকে তেল এবং খইল পাওয়া যায়। ভোজ্য তেলের পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল থেকে সাবান তৈরি হয়। তাছাড়াও তুলার বীজ থেকে পাওয়া খইল গবাদি পশু ও মাছের খাদ্য চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। এমনকি বীজের গায়ে যেসব আঁশ লেগে থাকে সেগুলো থেকে ব্যান্ডেজ (পটি), গজ, কটন বাড এসব বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি হয়। তুলার এই বহুমুখী ব্যবহার ওতপ্রোত ভাবে জড়িত আমাদের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে।

আখ:

অর্থকরী ফসলের মধ্যে আখ অন্যতম। আখ থেকে সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় চিনি ও গুড়। এ দুটি পণ্য ব্যবহার হয় বছরের প্রতিদিন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, সিলেট, ফরিদপুর, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, যশোর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী ও রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় চাষ হয় আখের। দেশে যে পরিমাণ আখ উৎপাদন হয় তা চাহিদার মাত্র ৫ ভাগ পূরণ করতে সক্ষম। ধীরে ধীরে কমছে আখ চাষের জমি।

দেশে ১৫ টি চিনিকল রয়েছে। আখের ৬০ ভাগ ব্যবহার হয় চিনি তৈরিতে আর বাকি ৪০ ভাগ ব্যবহার হয় গুড় ও অন্যান্য মিষ্টান্ন উৎপাদনে। আখ থেকে পাওয়া যায় কাগজ তৈরির কাঁচা মাল৷

বছরে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করা হয় ২৩ লাখ টন। যার বাজার মূল্য দশ হাজার কোটি টাকা। বছরে চিনির চাহিদা ১৫-১৬ লাখ টন। মাত্র ৬০-৭০ হাজার টন চিনি উৎপাদন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১৫ টি চিনিকল। চাহিদার বাকিটা যোগান দেয় বেসরকারি চিনি পরিশোধন কারখানাগুলো। চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাব মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১ লাখ ৫৯ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। দেশীয় সক্ষমতায় চাহিদার পুরোটা যোগান দেওয়া সম্ভব না হলেও আখ উৎপাদন বাড়িয়ে এবং চিনিকলগুলোর অবকাঠামোগত উন্নতি করে চাহিদার অনেকটাই মেটানো সম্ভব হবে। এরজন্য প্রয়োজন গবেষণা এবং কার্যকরি পদক্ষেপ।  

রাবার:

রাবার গাছ থেকে প্রাপ্ত এক ধরণের সাদা তরল পদার্থের নাম ল্যাটেক্স। এই তরল (ল্যাটেক্স) থেকে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয় রাবার। যা অনেক বেশি প্রসারণক্ষমতা সম্পন্ন, স্থিতিস্থাপকতা এবং জলনিরোধী৷ বর্তমানে সারাবিশ্বে বহুল ব্যবহৃত পণ্যের মধ্যে রাবার অন্যতম। আমাদের দেশ যেহেতু কৃষিনির্ভর তাই অনেক আগে থেকেই ভাবনা শুরু হয়েছে রাবার নিয়ে। রাবারকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়েছে আলাদা একটি খাত।

একলক্ষ বিশ হাজারের বেশি পণ্য তৈরি হয় রাবার দিয়ে। রাবার ব্যবহার হয় জুতো, গাড়ির টায়ার, পেন্সিলের দাগ মোছার রাবার, বোতল, রেক্সিন, ফোম, চিকিৎসা ও শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী সহ রাবার সোল, গ্যাসকোট, বাকেট এমন অনেক ভারী ভারী জিনিসও। এত ব্যবহারের কারণে রাবারকে বলা হয় সাদা সোনা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায় সরকারি ১৮ টি এবং বেসরকারি উদ্যোগে ১৩০৪ টি রাবার বাগান গড়ে উঠেছে। এত সম্ভাবনা থাকার পরও রাবার আমদানির ভ্যাট নামমাত্র। দেশে উৎপাদিত রাবারের ভ্যাট ১৫ শতাংশ আর আয়কর ৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে রাবার শিল্প ধীরে ধীরে আগাচ্ছে ধ্বংসের পথে৷ রাবার নিয়ে গবেষণা আর সকল সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে রাবার শিল্প অনেক বড় একটি খাতে পরিণত হবে। তখন দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে রপ্তানিও সম্ভব হবে৷ বর্তমানে রাবার আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিও হয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে উৎপাদিত রাবারের খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা মন্দ নয়।

মানিকগঞ্জের হাফসিল্ক সট্রাইপ শাড়ি
মানিকগঞ্জের হাফসিল্ক সট্রাইপ শাড়ি

সিল্ক:

মূলত সিল্ক বলতে আমরা পরিধেয় এক ধরনের দামি বস্ত্রকে বুঝি৷ ’মালবেরী বা তুঁত’ থেকে পাওয়া যায় সিল্কের মূল উপাদান। দেশের অর্থকরী ফসরের মধ্যে তুঁত অন্যতম। তুঁত গাছের ফল টক নয় এবং বেশ রসালো। এ থেকে তৈরি হয় জ্যাম ও জেলি। তুঁত গাছ ফলের জন্য নয় মূলত চাষ করা হয় পাতার জন্য৷ রেশম পোকা থেকে সংগ্রহ করা হয় সিল্ক সুতা। আর রেশম পোকার প্রধান খাদ্য তুঁত পাতা। চারা থেকে পরিণত গাছ হতে সময় লাগে ২/৩ বছর। পলু ঘরে তুঁতপাতা সরবরাহ করলে ২০/২৫ দিনের মধ্যে গুটি পাওয়া যায়।

এ কারণে আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় তুঁতের চাষ করা হয়। বর্তমানে রেশম বোর্ড থেকে বিভিন্ন প্রজেক্টের অধীনে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় তুঁত গাছ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কমই চাষ হয় বাংলাদেশে। রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় তুঁতের চাষ হয় সবচেয়ে বেশি। তুঁত চাষ হচ্ছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের অধীনে কাপাসিয়া, ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও মধুপুরের বিভিন্ন জায়গায়৷ এছাড়াও চাষ হয় রংপুর, লালমনিরহাট, বগুড়া সহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে।

কফি:

কফি বিশ্বের ২য় বাণিজ্যিক কোমল পানীয়। ২০০৫ সালের পর থেকে জনপ্রিয়তা পায় বাংলাদেশে। এরপর তা সর্ব মহলে সমান গুরুত্ব পেলে শুধু কফিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা ব্র্যান্ড ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। কফির সাথে আমাদের এত আবেগ, চাহিদা আর জনপ্রিয়তা থাকার পরও আমদানি করতে হয় ৯৫ ভাগ৷ ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট আমদানিকৃত কফির পরিমাণ ছিলো ৩২.৫৬৭ টন।

মাত্র কয়েক বছর আগে দেশে শুরু হয়েছে কফি চাষ। এখন পর্যন্ত চাষের প্রায় ৯০ ভাগ হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে। তবে কফি চাষে এগিয়ে বান্দরবান জেলা৷ ইদানীং টাঙ্গাইলেও শুরু হয়েছে কফি চাষ। কফিয়া ক্যানিফোরা এবং কফিয়া এরাবিকা নামক দুইটি জাত উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে কফি ও কাজুবাদামের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বারি’র যৌথ উদ্যোগে সোয়া দুইশত কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রতি বছর আমদানি করতে হয় প্রায় ১ হাজার টন কফি। আর দেশে উৎপাদন হয় মাত্র ৫৫ হাজার কেজি৷

বিশাল এই চাহিদা পূরণ করতে কফির উৎপাদন বাড়ানো দরকার। এতে রক্ষা পাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা এবং সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। সেদিক থেকে কফি নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। কফি থেকে পানীয়’র পাশাপাশি শ্যাম্পু এবং মধুও পাওয়া সম্ভব।

পান:

পানের সাথে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহুকাল ধরে। এটি কেবল সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে তা নয়, অন্যতম একটি অর্থকরী ফসলও। পান ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে, ১৭৬৭ সালে লর্ড ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে পান দিয়ে। দেশের প্রায় সব জেলাতে কমবেশি পান চাষ হয়। তবে বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, যশোর জেলায় হয় সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর দেশে ১২,৩২৬ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫৯,৮২৯ মেট্রিক টন পান চাষ হয়। যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে হয় রপ্তানিও।

পান চাষে বিখ্যাত রাজশাহী জেলা। গণমাধ্যমের সংবাদ সূত্র মতে, আমের চেয়েও দ্বিগুণ লাভজনক পান চাষ। আম নিয়ে প্রচুর গবেষণা, আলোচনা ও প্রচারণা করা হলেও পান নিয়ে নেই কোন প্রচেষ্টা। রাজশাহী জেলাতেই পান চাষ হয় ৪,৪৯৯ হেক্টর জমিতে। এ জেলার ৭২,৭৬৪ জন কৃষক পান চাষে জড়িত। এটি রাজশাহীর প্রধান অর্থকরী ফসল। লক্ষীপুরেও দিন দিন বাড়ছে পান চাষ৷

দেশের অধিকাংশ মানুষ পান খায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, নৈশ ভোজ, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে পান এখন সংস্কৃতির অংশ।

পান যে মৌসুমে আবাদ হয় সে মৌসুমের নামে নামকরন করা হয়। এছাড়াও অনেক অনেক জাতের পান আছে যেমন- মিঠা পান, সাদা পাতার পান, কাফুরী পান, সাঁচি পান, বাংলা পান, ঝাল পান, গাছ পান, মহানলী, ভাবনা, ভোলা পান, ভাওলা, সন্তোসী, জাইলো, রংপুরী, রাজশাহীর পান। এছাড়াও অঞ্চলভেদে বিভিন্ন জাতের নাম হয়। কাফুরী পান, সানচি পান এসব বিদেশেও রপ্তানি হতো।

বিশ্ববাজারে পানের সম্ভাবনা অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রতিযোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দখল করছে কছিু অংশ। পান চাষ যেহেতু ভিন্ন ধরনের তাই জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা দরকার। পান চাষে রয়েছে বহুমুখী সম্ভাবনা৷

সুপারি:

পান যেমন বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে, তেমনি পান আর সুপারিও একই সুতায় গাঁথা। সুপারি এক ধরনের ফল-ফসল। অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বিভিন্ন জায়গায় খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে পানের সাথে সুপারির দেখা মেলে। কেউ কেউ শুধু সুপারিই চিবিয়ে থাকেন৷

বাংলাদেশে প্রায় ৩৬৫০০ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হয়। আর ফলন হয় ২৬৫০০ মেট্রিক টন। দেশের বিভিন্ন জেলাতে সুপারির চাষ হলেও বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি জেলা অন্যতম৷ লক্ষ্মীপুরকে বলা হয় সুপারির রাজধানী। দক্ষিণাঞ্চলে ধানের পরেই চাষাবাদে সুপারির অবস্থান। লাভজনক ও অর্থকরী হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দেখা মেলে সুপারি গাছ। এলসি’র মাধ্যমে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে সুপারি রপ্তানি হয়৷ দক্ষিণাঞ্চলের গন্ডি পেড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, রংপুর, পঞ্চগডড়েও সুপারির আবাদ হয়৷

মসলা:

আদিকাল থেকে খাদ্যের সাথে মসলার সম্পর্ক৷ ভিন্ন রকমের মসলা ভিন্ন রকমের স্বাদ যোগ করে। আমরা সব ধরনের মসলা চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ না। তবে বেশ কিছু মসলা রয়েছে যা অর্থকরী ফসলের অন্তর্গত৷ এখানে তুলে ধরছি কয়েকটি-

  • রসুন: বাংলাদেশের অন্যতম একটি অর্থকরী মসলা রসুন। এটি খাবারের স্বাদ বাড়ায় এবং সুগন্ধ যোগ করে। এছাড়াও রসুনে রয়েছে স্বাস্থ্যগুণ। সারাদেশে ৬৬০০৯ একর জমিতে বছরে ১০২ হাজার টন রসুন উৎপাদন হয়৷ তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। মোট চাহিদার চার ভাগের একভাগ পূরণ হয় দেশে উৎপাদিত রসুন দিয়ে আর বাকি অংশ আমদানি করতে হয়। দিনাজপুর, রংপুর, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার কিছু কিছু জায়গায় ব্যাপক হারে রসুনের আবাদ হয়৷ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি উচ্চ ফলনশীল রসুনের জাত উদ্ভাবন হয়েছে। রসুন চাষে মনযোগী হলে দেশে উৎপাদিত রসুন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে৷

  • পেঁয়াজ : মসলাদার ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম একটি অর্থকরী ফসল বা মসলা। প্রতিদিন ব্যবহার করতে হয় এটি। পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৩য় হলেও আমদানিতে শীর্ষ। দেশের প্রায় প্রতিটা অঞ্চলেই কম-বেশি পেঁয়াজ চাষ হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ৩৩.৬২ লাখ টন। ১০ বছরে পেঁয়াজের চাষ বেড়েছে ৪১ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরে ২.৫৩ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে পেঁয়াজ। গত অর্থবছরে ১২ লাখ ৯৯ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। তা বিগত বছরগুলোর তুলনায় কম হলেও বাংলাদেশ এখনও পেঁয়াজ আমদানিতে শীর্ষ। সম্প্রতি পেঁয়াজের উচ্চ ফলনশীল কিছু জাত উদ্ভাবন হয়েছে। তাই আশা করা যায় লক্ষ্যমাত্রার অনেকাংশ পূরণ হবে দেশীয় উৎপাদনে।

  • মরিচ : মসলা উপকরণের মধ্যে মরিচ অন্যতম। এটি আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে৷ কাঁচা ও গুঁড়া দুই ভাবেই মরিচের বিপুল চাহিদা। বাংলাদেশে প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ৩৭ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন মরিচের ফলন হয়। এক সময় রংপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদন হলেও বর্তমানে বরিশাল জেলা এগিয়ে৷ এছাড়াও কুমিল্লা,  নোয়াখালী, রংপুর, বগুড়া, পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন জেলা মরিচ চাষের জন্য উপযোগী। দেশে উৎপাদিত মরিচ রপ্তানি করা হয় বিদেশে।

  • গোল-মরিচ: বিভিন্ন ধরনের মসলার পাশাপাশি গোলমরিচও এক ধরনের অর্থকরী ফসল। রান্নার স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ঔষুধি গুণাগুণ পাওয়া যায় গোলমরিচে। এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি মসলা। গোলমরিচ গাছ পরাশ্রয়ী। এখন বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা হয় গোলমরিচ। সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোলমরিচ চাষে জোড় দেয়া হচ্ছে৷ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে বিভিন্ন মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ছে এবং আমদানি নির্ভরতা কমছে।

  • বিলাতি ধনিয়া: বিলাতি ধনিয়া দেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের একটি অর্থকরী ফসল। উচ্চমূল্যের কারণে ব্যাপক  লাভজনক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ হয় বিলাতি ধনিয়ার। কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ’বারি বিলাতি ধনিয়া ১’ নামে একটি জাত উদ্ভাবন করেছে৷  বিশেষ করে নিউইয়র্ক, টরেন্টো, মধ্যপ্রাচ্য, স্কটল্যান্ডসহ লন্ডনের বাঙালি হোটেল গুলোতে বিলাতি ধনিয়ার ব্যাপক চাহিদা৷ ট্রপিক্যাল আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভিয়েতনাম, আসাম এবং বাংলাদেশ বিলাতি ধনিয়ার উৎপত্তিস্থল। আগে রাঙ্গামাটি জেলার ওয়াজ্ঞা, বেতবুনিয়া, কাউখালী, ঘাগড়া এলাকায় অনেক বেশি চাষ হতো। এখন রাঙ্গামাটি ছাড়াও খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, গাজীপুর, মধুপুরে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ হয় বিলাতি ধনিয়া। তা দেশের চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি করে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। সম্ভাবনাময় বিলাতি ধনিয়ার উৎপাদন গবেষণা, ট্রেনিং ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

  • মূর্তা গাছ: শীতলপাটি সিলেটের একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য। এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সব পরিবারেই গরম কালে ব্যবহার হতো শীতলপাটি। সিলেটের বালাগঞ্জে শীতলপাটি খুবই বিখ্যাত। এক সময় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়াতে শীতলপাটির কদর ছিলো চোখে পরার মতো৷ বাহিরের দেশ থেকে যখন কেউ বাংলাদেশে আসতো যাওয়ার সময় নিদর্শন হিসেবে নিয়ে যেতো মসলিন আর শীতলপাটি। রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদেও জায়গা পেয়েছিলো সিলেটের বালাগঞ্জের শীতলপাটি।

    শীতলপাটি তৈরি করা হয় মূর্তা গাছ দিয়ে। এই গাছের বেত দিয়ে নানান রূপ, রঙ ও গল্পের চিত্র ফুটিয়ে তুলা হয়। তা এতটাই সুপ্রসিদ্ধ যে, বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার লাভ করেছে শীতলপাটির কারিগর বা শিল্পীরা৷ রপ্তানির ফলে আয় হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা। তবুও হুমকির মুখে পড়েছে এই শিল্প৷ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মূর্তা চাষের জমি কমেছে। তাই এখন আর এত সহজলভ্য নয়। আর বিদ্যুৎ এর সহজলভ্যতা কমিয়েছে শীতলপাটি কদর। তবে দেশি পণ্য নিয়ে ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর সাবেক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রাজীব আহমেদ স্যারের প্রচেষ্টায় এই শিল্প  মাথা নাড়া দিয়ে উঠেছে।


এসব পণ্যগুলোর বাহিরেও অনেক ফসল আছে যা কম বা বেশি দেশের জিডিপিতে ভূমিকা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে ৷ প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতাই পারে আমাদের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করে তুলতে।

লেখিকাঃ Rockshana Akter Popy

5 thoughts on “বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল”

  1. Romena Wadud Deeba

    আদিকাল থেকেই আমাদের দেশ কৃষি পণ্যে সমৃদ্ধ,দেশের অর্থনীতিতে আমাদের কৃষিপণ্য সেসময় থেকেই অবদান রেখে আসছে। অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাট অন্যতম ভুমিকা রেখে আসছে, আপুর লেখা পড়ে অনেক কিছু জানলাম বরবরের মতোই চমৎকার উপস্থাপন। অসংখ্য ধন্যবাদ আপু।

  2. Salma Shabiha

    দেশী পণ্যের প্রচার প্রসার বাড়লে সবার সহযোগীতা পেলে এই খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হত।রপ্তানি যোগ্য কৃষি পণ্যের পরিমান আরো বৃদ্ধি পেত।

    তথ্য বহুল কন্টেন্ট সবার উপকার হবে ই-কমার্স ক্লাবে এসব কন্টেন্ট শেখার অন্যতম হাতিয়ার হবে

  3. আমাদের দেশের অর্থনীতি কৃষির উপর দাড়িয়ে ।
    এদেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া সবই কৃষি বান্ধব।
    আপু আপনার লেখায় অনেক অনেক তথ্য জানতে পারছি। অনেক ধন্যবাদ আপি

  4. Mousumi Akter

    বরাবরের মতোই আমাদের দেশের কৃষিজ পন্যগুলো নিয়ে খুব সুন্দর উপস্থাপন। অসংখ্য ধন্যবাদ ও ভালোবাসা আপু। অপেক্ষায় রইলাম এমন আরো অনেক আর্টিকেল পড়ার।

  5. Miftahul Jannat

    আমাদের দেশ কৃষি বিভিন্ন পণ্যতে সমৃদ্ধ।
    দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছে এই অর্থকরী ফসল গুলো। আমাদের দেশের অর্থকরী ফসল গুলো নিয়ে এমন বিস্তারিত আর্টিকেল এর মাধ্যমে অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। এমন একটি তথ্যপূর্ণ আর্টিকেল আমাদের দেশীয় কৃষি পণ্যগুলো সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে এবং হারিয়ে যাওয়া পণ্য গুলো পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারবে। 🥰

Write your comment

Scroll to Top