দেশীয় শাল আমাদের ঐতিহ্যের অংশ

শাল বলতেই আমর বুঝি কাশ্মিরি শাল কিংবা পাকিস্তানি বা খুব ভালো ফিনিশিং হওয়া বিদেশী কোন শাল। শালকে ঘীরে কোনদিন আমাদের মাথায় ছিলোই না যে কোয়ালিফাইড শাল আমাদের দেশের তৈরি হতে পারে।  অবশ্য মাথায় আসার জন্য যে প্রয়োজন হয় জানার, অন্তত শাল আছে কি কি বস শালগুলো কোথায় থেকে আসছে তা যে জানতে হবে এটাই তো মাথায় আসেনি। এর পিছনে বড় যে কারণ  সেটাই হলো দেশীয় শাল সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতা। অথচ আমাদের দেশ তাঁত শিল্পে বিখ্যাত এটা আমরা কে না জানি। তাঁত এ তৈরি হয় শাল, তাঁত আছে প্রতিটা জেলায়৷ অর্থাৎ শাল এর অভাব আমাদের নিজেদের দেশে ই নেই৷ দেশের এত তাঁত, তাঁত এ এত শাল এসব নিশ্চয়ই যুগের পর যুগ লস হলে তৈরি হতোনা, অথচ এখনো বেশ কিছু জেলার তাঁত শিল্পের বছরের একটা সময়ের কেন্দ্রবিন্দু তে ই থাকে শাল,  প্রোডাকশন হয় মানে বিক্রি ও হয়, সেসব কারা কেনে?

দেশীয় জামদানী শাল

আমরা ই কিনি, অর্থাৎ আমরা আমাদের দেশীয় শাল এর গ্রাহক কিন্তু নাম বদলে। বিষয়টা মেনে নিতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য যে দেশে তৈরি অনেক শাল আমরা বিদেশী শাল ভেবেই কিনে এসেছি দিনের পর দিন।  তাই সময় টা ই এখন আমাদের দেশীয় শাল নিয়ে ভাববার এসব  এই সেক্টর টা কে তুলে ধরার, যাতে করে সচেতনতা বাড়ে, আগ্রহ জন্মায় দেশীয় শাল নিয়ে৷ আমাদের ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি রাজিব আহমেদ এর চেষ্টায় দেশীয় বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে অনেক ধরনের শাল৷ সেসব শালগুলো নিয়ে জানা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশীয় শাল এর ক্ষেত্র অনেক বড় হতে পারে। 

শাল এর শুরু টা কোথায়?

শাল এর শুরু নিয়ে অনেক বাকবিতন্ডা আছে কিন্তু এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই যে শাল এর শুরু প্রাচীন সময় থেকেই৷ আঠের দশকের ও বিভিন্ন নিদর্শনে শাল ফুটে উঠেছে। ইতিহাসে শাল এর শুরু নিয়ে যত গল্পই উঠে এসেছে তার মধ্যে সবথেকে গ্রহণযোগ্য সময় হলো চতুর্দশ শতাব্দী।  সেই সময়ে একজন অসাধারণ ব্যক্তি যিনি কাশ্মীর এর সংস্কৃতি,  শিল্প, অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছিলে,  সায়েদ আলী হামদানী,  তিনি বেড়াতে যান লাদাখ এ। তিনি যেহেতু অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভীষণভাবে ডেডিকেটেড ছিলেন, সেখানকার ভেড়ার পশম দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে এটি দিয়ে অত্যন্ত ভালো মানের শীত নিবারণের কিছু তৈরি করা সম্ভব। তখন তিনি সেই সফট,  মসৃণ ভেড়ার পশম থেকে মোজা বানান এবং মোজা ও অত্যন্ত সিল্কি,, উজ্জ্বল ও সুন্দর বুননের হয়৷ সেই মোজা গিফট করেন কাশ্মীর এর রাজাকে এবং হামদানী রাজাকে পরামর্শ দেন যেন ভেড়ার এই উন্নতমানের পশম কে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভাবে ব্যবহার করেন এবং শাল এর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। এভাবেই আসলে শাল এর সূচনা হয়।

পরবর্তী তে পঞ্চদশ শতাব্দী তে শাল এর ক্ষেত্র অনেক বড় হয়। অনেক কর্মসংস্থান, বাণিজ্য গড়ে উঠে শাল কে ঘীরে।  মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর এর সময়েও শাল এর আধিপত্য ছিলো। সেই সময় তিনি তার দরবারের সদস্যদের ভালো কাজের পুরস্কার স্বরূপ স্পেশাল পুরস্কার ‘খিলাত’ এ ভূষিত করতেন। এই খিলাত এর অংশ ছিলো তখন শাল এবং এই রীতি তার নাতী পর্যন্ত ও ছিলো।

এই ধারাবাহিকতা থাকে অনেকটা সময় পর্যন্ত। বিভিন্ন দেশে রাজকীয় পোশাকের সাথে একপাশে শাল ব্যবহার করেন রাজ দরবারে, অনেক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এর অংশ হয় শাল, রাণীদের প্রিয় পরিধেয় বস্ত্র হিসেবে থাকে শাল, দেশ থেকে দেশান্তরে পাড়ি দেয় শাল।

আঠারো শতাব্দীর দিকে ফ্রান্স এ শাল এর আধিপত্য এতই বেড়ে যায় যে শাল কে আভিজাত্যের নিদর্শন হিসেবে দেখা হতো৷ কুইন ভিক্টোরিয়া, ফরাসীদের সম্রাজ্ঞী জোসেফাইন সহ  তখনকার যুগের অভিজাত সমাজের নারী পুরুষের পোশাকের অংশ হিসেবে ছিলো শাল।  বিভিন্ন বিয়ে, প্রোগ্রাম, রাজকার্য, দেশ বিদেশের বৈঠক সবকিছুতেই শাল এর দেখা মেলে।।।

আমরা আমাদের কবি সাহিত্যিক দের ছবি দেখলে সহজেই আন্দাজ করতে পারি যে শাল তাদের পছন্দের বস্ত্রের একটি ছিলো। যুগে যুগে নানান সময় বিভিন্ন সাহিত্যে উঠে এসেছে শাল এর বর্ণনা৷ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ তে ও শাল পরনে সৌন্দর্যের প্রকাশের বর্ণনা পাওয়া যায়। এখনো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সন্মাননায় শাল উপহার হিসেবে দেয়া হয়। ২০১৯ সালে যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটা নিউজ এ ই পেলাম যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংক কে হাতে বোনা শাল উপহার দেন মোদি

 আমাদের ২০১৯ এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে যান টেস্ট খেলায় আমন্ত্রিত হয়ে তখন ও সিএবি থেকে তাকে শাল দেয়া হয়৷ আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরণের নাগরিক সংবর্ধনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং অন্যান্য অনেক সন্মানসূচক আয়োজনের সন্মাননা হিসেবে শাল উপহার দেয়া হয়৷ শাল ব্যাপার টা এতটা ই গর্বের।

শাল ব্যাপার টা অনেক গর্বের হলেও আমাদের দেশের দেশীয় শাল নিয়ে আগ্রহ বা প্রচারণা সব ই কম। তাই আমরা জানিনা অনেক কিছুই।  কত ধরনের শাল আছে তা নিয়ে আইডিয়া ও নেই,  তবে আইডিয়া পূর্বে না থাকলেও ২০২১ এ ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি রাজিব আহমেদ এর ডাকা শাল ওয়েভ এবং শাল নিয়ে সিরিয়াসলি দেশীয় পণ্যের উদ্যোক্তাদের কাজ করার জন্য অনেক শাল এর নাম উঠে এসেছে যা আমরা আগে জানতাম ই না৷ তেমন ই কিছু শাল এর নাম এখানে তুলে ধরছি যা আসলে নামকরণ করা হয়েছে মূলত সুতার কোয়ালিটি,  কি সুতা ব্যবহার করা হয়, কোন ডিজাইন এ কাজ করা হয়েছে, তাঁত এলাকা, তাঁতীদের কাজের অনুসারেঃ

১. আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের শাল

২. আড়ং শাল

৩. উল সুতার শাল

৪. এক কালারের শাল

৫. এপ্লিক শাল

৬. এম্ব্রয়ডারির শাল

৭. কাতান শাল

৮. কটকি শাল

৯. কাঁথা স্টিচ শাল

১০. কোমড় তাঁতের শাল

১১. কুশি কাটার  শাল

১২. কল্লা শাল

১৩. খাদি শাল

১৪. খেস শাল

১৫. গামছা শাল

১৬. গোলাপ শাল

১৭. গ্রামীণ চেক শাল

১৮. চুমকি শাল

১৯. জামদানি শাল

২০. জামদানী মোটিভ এর ব্লক শাল

২১. জারদৌসি শাল

২২. জড়ি সুতার শাল

২৩. টাঙ্গাইলের তাঁতের শাল

২৪. টাইডাই শাল

২৫. টুইস্ট সুতার খাদি শাল

২৬. ডিজিটাল প্রিন্টের শাল

২৭. তাঁত এর শাল

২৮. দেশীয় পাসমিনা শাল

২৯. ধুপিয়ান শাল

৩০. নরসিংদীর ভিসকস শাল

৩১. নকশি ফোঁড়ের শাল

৩২. নেট এর শাল

৩৩. নোয়াখালীর গান্ধী আশ্রমের শাল

৩৪. নিব খাদি শাল

৩৫. পঞ্চ শাল

৩৬. পাঁচ হাত শাল

৩৭. প্যাচওয়ার্ক এর শাল

৩৮. প্রজাপতি শাল

৩৯. পুতুল শাল

৪০. পাশমীনা শাল

৪১. পশমি শাল

৪২. পিনন শাল

৪৩. পাওয়ার লুমের লাল

৪৪. পাটের শাল

৪৫. বাটিক শাল

৪৬. বার্মিজ শাল

৪৭. বম শাল

৪৮. ব্লকের প্রিন্টার শাল

৪৯. বগুড়ার শাল

৫০. ব্রাশ পেইন্ট খাফি শাল

৫১. ভিছা শাল

৫২. ভেলভেট এর শাল

৫৩. ভিসকস পশমিনা শাল

৫৪. ভিসকস সুতার মোমবাটিক শাল

৫৫. ভাবতা খাদি শাল

৫৬. মনিপুরী শাল

৫৭. মনিপুরী হাওফী শাল

৫৮. মেশিন এমব্রয়ডারি শাল

৫৯. মোটা সুতি কাপড়ের শাল

৬০. মালা শাল

৬১. মনিপুরী চুমকি শাল

৬২. মনিপুরী চিকন উলের শাল

৬৩. মনিপুরী মোটা উলের শাল

৬৪. মনিপুরী পাটি বুননের শাল

৬৫. মখমল শাল

৬৬. মসলিন শাল

৬৭. মধুপুর এর মান্দি শাল

৬৮. মহেশখালী র শাল

৬৯. রাখাইনদের শাল

৭০. রাজিব শাল

৭১. রাজশাহী সিল্ক শাল

৭২. রাজশাহী কাতান শাল

৭৩. রংপুরের এক ধরনের উলের শাল

৭৪. লতিপাতা শাল

৭৫. লিলেন শাল

৭৬. লাউয়াছড়া’র উপজাতিদের তৈরি শাল

৭৭. সুতার কাজ করা শাল

৭৮. স্ক্রিনপ্রিন্ট শাল

৭৯. হাতের কাজের পুতির শাল

৮০. হ্যান্ড পেইন্ট শাল

৮১. হ্যান্ডলুম শাল

আমাদের দেশীয় বেশ কিছু শাল কে  সংক্ষিপ্তভাবে এখানে তুলে ধরছি…

জামদানী শালঃ

জামদানী শাড়ির জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণই এর নিজস্বতার কারণে। জামদানীর বুনন, জামদানীর ডিজাইন এতটাই ইউনিক এবং সুন্দর যে সব নারীর ই এর প্রতি একটা দূর্বলতা থেকেই যায়। শুধু বাংলাদেশ না, দেশের বাহিরে ও এর সুনাম ছড়িয়ে আছে। জামদানী আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য আর এজন্যই জামদানী ২০১৬ সালে আমাদের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি ও পায়৷

জামদানী শাল

জামদানী বলতে আমরা শাড়ি কে বুঝালেও জামদানীর বিস্তার ঘটেছে  অন্যান্য অনেক পণ্যের মাঝেও। আর এর মধ্যে শাল অন্যতম। জামদানী শাল মূলত চাকমা উপজাতি রা বুনন করতেন এক সময়৷ চাকমা নারীরা সবাই ভীষণ ই কর্মঠ, নিজেদের প্রয়োজনীয় বেশিরিভাগ দ্রব্যাদি ই তাদের নিজেদের প্রস্তুত করা থাকে, তারা সম্পূর্ণ নিজেদের প্রয়োজনে শুরুতে শাল বুনন এর কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে এর চাহিদা বাড়তে থাকে এবং বাণিজ্যিক ভাবে ও শাল বুনতে শুরু করেন তারা৷ শাড়ির মত শাল এ ও বিভিন্ন কাউন্ট সুতা মেইনটেইন করা হয়, পাড় এর দিকে ১৪০ জোড়া ও জমিনে ৩০০ জোড়া কাউন্ট ধরে তারা শাল তৈরি করেন। পুরো শাল ই হস্তচালিত তাঁত এ তৈরি করা হয় এবং পারিবারিক অন্যান্য কাজের পাশাপাশি চাকমা নারীরা এসব শাল বুনেন, তাই এসব শাল তৈরি তে একটু বেশি সময় লাগে, ডিজাইন এবং সময় দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একেক টা শাল তৈরিতে ই ৩ থেকে ৭ দিন সময় লেগে যায়৷।

জামদানী এসব শাল চাকমাদের দিয়ে শুরু হলেও বাংলাদেশ এর বিভিন্ন জায়গায় যেহেতু তাঁত আছে তাই তৈরি ও হচ্ছে নরসিংদী,  টাঙ্গাইল সহ অনেক জেলাতেই।

বেশিরভাগ সময় ই উলের সুতায় বুনন করা হয় জামদানী শাল তাছাড়া বাহির থেকে আমদানীকৃত সুতা,  এক্রিলিক উলেন সুতা দিয়েও তৈরি হয় জামদানী শাল। জামদানী শাল সহ বিভিন্ন সুতার শাল এ একটা ব্যাপার মেইনটেইন কএয়া হয় তা হলো ডাবল বুনন বা সিংগেল বুনন। এলাকাভেদে, ক্রেতাভেদে হালকা বা ভারী শাল পছন্দ করেন সবাই আর শাল হালকা হবে নাকি ভারী তা ডিপেন্ড করে মূলত এই বুনন এর তারতম্যের জন্য৷

জামদানী ডিজাইন টা এতটা ই জনপ্রিয় যে জামিদানী মোটিফ ও আমাদের ভীষণ পছন্দের জায়গা,  বিশেষ করে শাল এর ক্ষেত্রে তো অনন্য একটি জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন মোটিফ এর  জামদানী শাল৷

জামদানী মোটিফ এর ব্লক এর শাল হয়, যা সাধারণত উল,  ভিসকস বা সিল্ক সুতায় তৈরি এক কালার শাল এর উপর জামদানী নকশায় কাঠব্লকের কাজ করা হয়৷ এই ডিজাইন বিভিন্নভাবে শাল এ ফুটিয়ে তোলা হয় তা শাল এ দারুণ ভ্যারিয়েশন আনে।

জামদানী ডিজাইন এ হাতের কাজের শাড়ি যেমন আমরা দেখেছি,  জামদানী মোটিফ এ শাল ও তৈরি হয়। বিভিন্ন সুতার তৈরি এক কালার এর শাল এ জামদানী ডিজাইন এ রঙ বেরং এর সুতা দিয়ে কাজ করা হয়।  অত্যন্ত গর্জিয়াস এ শাল গুলো শাল এর সেকটরে খুব জনপ্রিয়তার সাক্ষী রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

জামদানী শাড়ি কেটেও এক কালার এর শাল এ বসিয়ে জামদানী মোটিফ আনা হচ্ছে শাল এ।  আবেগের সাথে জড়িয়ে থাকা জামদানীকে আমরা বিভিন্ন ভাবে শাল এ পাচ্ছি যা আমাদের শাল এর সেকটর কে প্রসারিত করছে নিঃসন্দেহে।

এছাড়া ও টাঙ্গাইল এর তাঁত এ ও তৈরি হয় জামদানী শাল। মেশিনলুম এ কিছু জামদানী শাল তৈরি হয় যার আউতা আসে পাকিস্তান থেকে। মেশিন তাঁত এ ফিনিশিং এত সুন্দর হয় যা বাজারে বিক্রি ও হয় কাশ্মিরি শাল বলে। এত টা কোয়ালিফাইড এই শালগুলো যে মানুষের মনে কোন দ্বিধা ও আসেনা এগুলো আসলেই কাশ্মিরি নাকি না। সঠিক প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের দেশীয় শালগুলোই শক্ত একটি অবস্থান পেতে পারে কেননা এই শাল সিরিয়াসলি গুণে মানে সেরা।

বম শালঃ

বাংলাদেশ এ ৪৫ টি উপজাতির বাস। এদের মধ্যে বম একটি জনগোষ্ঠী।  বান্দরবান জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি,  রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি সহ ৭০ টি গ্রামে এই উপজাতিদের বাস৷ বম রা পির্তৃপ্রধান উপজাতি, পিতার উপর ডিপেন্ড করেই দিনাতিপাত করলেও এ উপজাতির নারী রা ভীষণ ই কর্মঠ৷ পুরুষদের পাশাপাশি তারাও কাজ করে, তাদের কিছু অংশ বাগান বা ক্ষেত খামারে কাজ করলেও বেশিরভাগ নারী রা ই তাঁত এ কাপড় বুনেন এবং এটা তারা জন্মগতভাবেই পারদর্শী  হয়ে যায়৷ কোমড় তাঁত এ তারা বিভিন্ন বস্ত্র তৈরি করে, এর মাঝে শাল অন্যতম।

তাদের এ শাল বিক্রি ও হয় প্রচুর, যা র বড় ক্রেতা হলেন এইসব এলাকার পর্যটক রা৷।

প্রতি কেজি সুতা থেকে দুইটা করে শাল বুনতে পারেন তারা। তাদের এ শালগুলো বিভিন্ন রঙ এর হয় এবং খুব আরামদায়ক ও  শীত নিবারণের জন্য দারুণ ভাবে উপযোগী ও৷

বম শাল

পূর্বে বম শাল বলতে উপজাতিদের এ শাল গুলো বুঝানো হলেও টাঙ্গাইল এর তাঁত এ ও এখন বম শাল তৈরি হয়৷ হালকা, ভারী দুইভাবেই বোনা হচ্ছে। পাড় এ সমান্তরাল নকশা দিয়ে এসব শাল এর শুরু হলেও এখন তা পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন ডিজাইন এ। লতানো ডাল, ফুল, মন্দির, জামদানীর কল্লা পাড় এমন বিভিন্ন নকশা ই থাকে এই শালগুলোতে, এছাড়া ও কয়েক কালার এর সুতা একসাথে করে ও রংধনুর মত রঙ এ রাঙিয়ে কিছু বম শাল তৈরি হয় এখন তাঁত এ৷

খাদি শালঃ

খাদি আমাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা একটা নাম যা র শুরু টা ই হয়েছিলো ১৯২১ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়, যখন মহাত্মা গান্ধী বিদেশী পণ্য বর্জন এর ডাক দেন। কুমিল্লার গান্ধী শ্রমে তৈরি হয় এসব কাপড়, এখন চান্দিনা উপজেলায় বেশ কিছু তাঁত রয়েছে যেখানে খাদি কাপড় তৈরি হয়। পূর্বে খাদিতে তেমন ভ্যারিয়েশন না থাকলেও এখন খাদির মাঝে অনেক ভ্যারিয়েশন আছে, নানান ধরনের আইটেম তৈরি হয় এই খাদি থেকেই৷ এখন তো খাদি খাপড়ের শাল ও তৈরি হয় যা খুব গ্রহণযোগ্যতা ও পেয়েছে। ১৯৯৪ সালে খাদি পুরস্কার ও পায় তাদের গুণগত মানের জন্য।

খাদি মানেই অমসৃণ ধারণা টা ও বদলে গেছে এখন। মেশিনলুম এর মাধ্যমে খাদির যে বস্ত্র গুলো আমরা দেখতে পাই তা খুব সুন্দর ফিনিশিং এর। এরপর ও খাদির যে ঐতিহ্য সেই ছোঁয়া টা পাওয়া যায় হ্যান্ডলুম এর সেই গর্ত তাঁত এ ই তাই গর্ত তাঁত এর খাদিই সবার প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে৷

খাদি শাল এ এপ্লিক, হাতের কাজ, চুমকি র কাজ, এমব্রয়ডারি, ব্লক, হ্যান্ডপেইন্ট এমন অনেক ভ্যারিয়েশন আনছেন দেশীয় বিভিন্ন উদ্যোক্তা রা যারা এই খাদি নিয়ে কাজ করছেন।

খেশ শালঃ

আমাদের দেশের জন্য খেশ সম্পূর্ণ নতুন একটি পণ্য যা শাড়ি হিসেবেই প্রথম পরিচিতি পায় এবং এখন খেশ এর শাল ও আমরা দেখতে পাচ্ছি। খেশ আমাদের আবেগের সাথে জড়িত কেননা খেশ এর সাথে আমরা বারবার খুঁজে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর নাম, শান্তিনিকেতন এ খেশ বুননের ঘটনা। খেশ রিসাইক্লিং পণ্য, পুরাতন শাড়ির ফালি দিয়ে তৈরি হয় খেশ যা পরিবেশবান্ধব ও বটে। খেশ এর শাল অনেক উষ্ণতায় ভরপুর।

খেশ শাল

খেশ শাল ও উলের অন্যান্য শাল এর মত হালকা বা ভারী করে বানানো যায়। খেশ এ যেহেতু পুরাতন কাপড়ের স্ট্রাইপ থাকে সে এক কালার এর খেশ এর উপর বিভিন্নভাবে মোডিফাই করা যায়। আমরা আমাদের দেশেই এ বছর খেশ শাল এ ব্লক দেখেছি, খেশ শাল এ এমব্রয়ডারি কাজ, হাতের কাজ দেখেছি, হ্যান্ডপেইন্ট খেশ শাল ও দেখেছি। খেশ এ যত বেশি ভ্যারিয়েশন আসে বা একটি শাল এ যতটা সুন্দরভাবে মোডিফাই করা হয় শাল দেখতে ততটা গর্জিয়াস লাগে। বিয়ে বাড়ি থেকে বাসায় নরমাল ইউজ সব জায়গায় শীতের মৌসুমের সঙ্গী হয় এসব শাল আমাদের।

সিল্ক শালঃ

বস্ত্রশিল্পে সেরা একটি নাম আমাদের সিল্ক। সিল্ক এর সুনাম সারা বিশ্বজুড়ে এবং সিল্ক এর রাজত্ত্ব ও ছিলো এক সময়। সিল্ক হাড়িয়ে যায়নি, উঠে আসছে আবারো, এখনকার সময়ে ই-কমার্স এর মাধ্যমে সিল্ক এর পরিধি আরো বেড়ে চলছে।

সিল্ক এর শাল হয় তা এতদিন অজানা থাকলেও ২০২২ সালে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে সিল্ক শাল৷ বিভিন্ন ধরনের সিল্ক শাল আছে যা আমাদের দেশে ই পাওয়া যায়, যেমনঃ

▪️ ধুপিয়ান সিল্ক শাল

▪️ মটকা সিল্ক শাল

▪️ জয়শ্রী সিল্ক শাল

▪️ এন্ডি সিল্ক শাল

এসব শাল এর ভেতর আবার মোডিফাইড হয় অনেক ধরনের। সিল্ক এ হাতের কাজ, ব্লক, পেইন্ট, এম্বুশ, চুমকির কাজ করা হয়। সিল্ক শালগুলো তুলনামূলক ভাবে পাতলা হলেও উষ্ণতা দেয় ভীষণ, যা নারী পুরুষ নির্বিশেষে ব্যবহার করতে পারে। সিল্ক এর শাল এর সুন্দর একটা গ্লেসি ভাবের জন্য সিল্ক বিবাহ, পার্টি তে ব্যবহার উপযোগী।  হিন্দু বিয়েতে বরের গায়ে শাল ছাড়া বিয়েই হয়না সেক্ষেত্রে সিল্ক এর শাল একটি সুন্দর অপশন হতে পারে তাছাড়া এখন শুধু হিন্দু না মুসলমান রা ও বিয়েতে ট্রেডিশনাল লুক দিতে শাল ক্যারি করে, সিল্ক এর শাল সেই জায়গাটা নিতে পারে।

বাটিক শালঃ

প্রাচীনকালে যখন অত্যাধুনিক কোন যন্ত্র ছিলো না, প্রিন্ট করার কোন মেশিন ছিলোনা তখন ও তো প্রিন্ট এর কাপড় পরিধান করতো মানুষ৷ সেই সময় প্রাকৃতিক বিভিন্ন পন্থা কে বেছে নিতো মানুষ কাপড় কে রঙিন করতে, কাপড়ে প্রিন্ট করতে৷ রঙ নিয়ে খেলার মত করেই কিন্তু অনেক বেশি শ্রমসাধ্য এ বিষয় এ তৈরি হতো রঙ বেরং এর বস্ত্র। তেমনি একটি পদ্ধতি কাপড়ে নিজের আঁকিঝুকি করে মোম এর প্রলেপ দিয়ে রঙ করা, যাতে করে মোট এর জায়গাটায় রঙ প্রবেশ না করে অত্যন্ত সুন্দর রূপ লাভ করতো। আর এভাবেই বাটিক শিল্প ধীরে ধীরে এতটা জনপ্রিয়তা লাভ করে৷ একেবারে সঠিক তথ্য টা না থাকলেও ধারণা করা হয় বাটিক এর উৎপত্তি ইন্দোনেশিয়া থেকেই এবং ইন্দোনেশিয়া তে বাটিক কে তাদের ঐতিহ্যের অংশ ই ধরা হয়।

দেশীয় বাটিক শাল

বাটিক যেমন বস্ত্রে করা যায় তেমনি চামড়া তে ও বাটিক প্রিন্ট করা যায়। বাটিকে যেমন কেমিক্যাল রঙ ব্যবহার করা হয় তেমনি প্রাকৃতিক ও৷ নীল, তুঁত, গাঁদাফুল, খয়ের, শিউলীফুল, পেঁয়াজের খোসা, হরতকী,  লাল বাঁধাকপি, বেগুনি আঙ্গুর, পীচ পাতক, ঘাস, চা, কফি, ওক গাছের বাকল,  হলুদের শিকড় এসব থেকেও বাটিক এর রঙ তৈরি হয়৷ আমাদের দেশে যেসব বাটিকের প্রচলন দেখা যায় তা হলোঃ

▪️ মোম বাটিক

▪️ কুমিল্লার বাটিক

▪️ টাই ডাই বাটিক

▪️ চুনরি বাটিক

▪️ তুলি বাটিক

▪️ শিবুরি বাটিক

▪️ মাকড়সা বাটিক

বাটিক এক সময় শুধু সুতির  উপর করা হয় ধারণা করা হলেও এখন এ ধারণা চেঞ্জ এবং সিল্ক, গরদ, তসর মসলন, এন্ডিকটন, খাদি এমন অনেক কাপড়েই করা হয়। আর এর ই রেশ ধরে এসব কাপড়ের যে শাল আছে তাতেও  বাটিক প্রিন্ট করা যায়। ভিসকস ডাবল সুতার শাল এ বাটিক করানো হয় যা অত্যন্ত সুন্দর হয়। এছাড়া ও বাটিকের শাল এ হাতের কাজ করিয়ে, চুমকি পুঁথি লেইজ লাগিয়ে আরো অনেক সুন্দর করা যায়। উদ্যোক্তা রা একেকটি পণ্যকে বিভিন্নভাবে প্রেজেন্ট করার চেষ্টা করছেন ই-কমার্স এর হাত ধরে, শাল কে ও  যা আমাদের শাল এ আনছে ভিন্নতা ও আধুনিকতা।

মনিপুরী শালঃ

মনিপুরী উপজাতিদের নিজেদের তাঁত এর তৈরি শাড়িগুলো যেমন জনপ্রিয়তার শীর্ষে পিছিয়ে নেই শাল ও। কোমড় তাঁত এ তৈরি এ শালগুলো মনিপুরীদের নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে করা। শাড়ির মত শাল এ ও তারা টেম্পল বা ত্রিভূজাকার সেই নকশা যাকে তাদের ভাষায় মৈরাঙ্গ বলে তা আছে। শুধু যে এই পাড় এ ই শাল হচ্ছে এমন না, ঝাউগাছ,  শিউলি ফুল, সরলরেখা এমন বিভিন্ন নকশা হয় শাল এ।

মনিপুরি শাল

তারা যেমন কোমড় তাঁত এ শাল তৈরি করে তেমনি মেশিনতাঁত এ ও করে। তবে মেশিনতাঁত এর বুননের শাল গুলোকে তারা পাটি শাল ও বলে থাকে৷ মনিপুরীর ডিজাইন ভেদে যত ডিজাইন ই উঠে তার মধ্যে মন্দির শাল ও পাট শাল বেশি চাহিদাসম্পন্ন। 

উলের সুতায় বোনা এ শালগুলো সাধারণত মোটা হয়, হালকা হয় এবং লম্বা হয়। এই তিন প্যাটার্ন ভেদেই শাল তৈরি করেন মনিপুরী নারীরা।

ভিসকস শালঃ

ভিসকস প্রাকৃতিক এক ধরনের সুতার প্রধান কাঁচামাল এটি এক ধরণের রেশম যা থেকে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে সুতা তৈরি করা হগ।। প্রকৃতি থেকেই এর উৎপত্তি৷ কাঠ বা তুলার মন্ড বা পাল্প থেকে যে বিশুদ্ধ সেলুলোজ পাওয়া যায় তা থেকেই একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় ভিসকস সুতা এবং এর পর ই এই সুতা থেকে উন্নতমানের পোশাক তৈরি হয়।

সুতি সুতার থেকেও অত্যন্ত নমনীয় এক ধরনের সুতা ভিসকস। খুব বেশিই সূক্ষ্ম ও মিহি এ সুতা গুলো। তাই এই সুতা দিয়ে তৈরি যেকোন বস্ত্রের চাকচিক্য হয় অন্যরকম এবং মসৃণ ও গ্লেসি হয়। আঁখ থেকেও ভিসকস পাওয়া যায় তবে তার পরিমাণ কম। পাট থেকেও বাণিজ্যিক ভাবে ভিসকস তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এটি হলে খুব ই ভালো হবে কেননা পৃথিবীতে যত সুতা তৈরি হয় তার ৬৭ ভাগ ই আসে ভিসকস এবং অন্যান্য সিনথেটিক সুতা থেকে।

ভিসকস সুতা দিয়ে পরিধেয় বস্ত্রগুলোর পানিশোষণ ক্ষমতা বেশি তাই রঙ বা  ডায়িং খুব ভালোভাবে বসে এতে। আর এজন্যই ভিসকস এর সুতায় তৈরি এক রং এর শালগুলোকেই  নিয়ে পরবর্তী বিভিন্ন প্রসেসিং করা হয়। যেমনঃ বাটিক, টাই-ডাই, ব্লক, এপ্লিক, স্ক্রিনপ্রিন্ট, কাটওয়ার্ক, সুতার কাজ, বা বিভিন্ন কিছু। এমনকি ভিসকস শালের উপর ই কটকি নকশার কাজ করে শালকে অন্যরকম মাত্রা দেয়া হয় টাঙ্গাইল এ। ভিসকস এর এমন অনেক ভ্যারিয়েশন আছে যেখানে যা শালগুলোকে অনেক আকর্ষণীয় করে তোলে৷ সফটনেস এর জন্য ক্যারী করতেও ভীষণ আরাম ফিল হয়। তাছড়া সিংগেল এবং ডাবল বুনন এর জন্য বিভিন্ন মৌসুমে ব্যবহার করা যায় বেশি শীত বা কম শীত এর সাথে মানিয়ে যায় সুন্দরভাবেই।

বগুড়ার শালঃ

বগুড়াতে আদমদিঘীর শাওইল এলাকা জুড়ে যেসব তাঁত রয়েছে, এইসব তাঁত এ  তৈরি ই হয় মূলত শাল, চাঁদর ও কম্বল। নব্বই এর দশকে যখন দেশে গার্মেন্টস ও স্যুয়েটার ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয় ঠিক তখন ই এসব এলাকায় শাল,  চাঁদর তৈরি ও বৃদ্ধি পায়, তার আগে এখানে মশারি ও গামছা তৈরি করেই দিনাতিপাত করতে হতো। সুয়্যেটার কোম্পানি গুলো থেকে পরিত্যক্ত সুয়্যেটার গুলো ই হলো এসব শাল তৈরির প্রধান কাঁচামাল, যা এখানে কিনে এনে এরা সুতা প্রস্তুত করে।

আগে খটখটি তাঁত বা গর্ত তাঁত এ এবং চিত্তরঞ্জন তাঁত এ তৈরি হতো শাল যাতে ডগির সাহায্যে একটু নকশা ও তোলা হতো, যেখানে এক দিনে ৫-৭ টার বেশি প্লেইন শাল তোলা যেত এখন এখানে বিদ্যুৎচালিত তাঁত বা সেমিপাওয়ারলুমে শাল বোনা হচ্ছে ২০-২২ টা।

এসব এক কালার এর শালে হাতের কাজ করেন বগুড়া তে ই বিভিন্ন কর্মীরা। এমন অনেক উদ্যোক্তা আছে,  সংস্থা আছে যেখানে শাল এর উপর হাতের কাজ, চুমকি ও এপ্লিক এর কাজ করেন বাণিজ্যিকভাবেই। 

এখানে যেমন শাল চাঁদর এর হাট বসে সপ্তাহে দুইদিন, তেমনি ঝুট সুতার একমাত্র বাজার টা ও এখানেই৷ ঝুট সুতা এবং তার কর্মকান্ডের উপর ভিত্তি করে এমহানে ১৩ শতাধিক দোকান গড়ে উঠে৷ এই বাজারে এক বছরে আয় হয় প্রায় ১,২৭৮ কোটি টাকা যা শধুমাত্র শীত বস্ত্র ও ঝুট সুতার।

টাঙ্গাইল এর শালঃ

টাঙ্গাইল এর শাড়ি এবং থ্রিপিস এর পাশাপাশি টাঙ্গাইল এর শাল ও প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয় ,  যা শুধু আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার না রপ্তানি হয় বাহিরেও৷ এত এত ধরণের শাল আছে গণনা করাও মুশকিল। হ্যান্ডলুম, মেশিনলুম দুই ধরনের তাঁত এ ই শাল তৈরি হয় এবং দুটোর ই বাজার অনেক বড়।

টাঙ্গাইল এ সারাবছর চলে টুকটাক শাল এর কাজ তবে মৌসুমে তার পরিমাণ বেড়ে যায়। দেলদুয়ার, বাসাইল, কালিহাতী ও সদর উপজেলার বভিন্ন তাঁতপল্লীতে তৈরি হয় টাঙ্গাইল এর বিভিন্ন ধরনের শাল। দেলদুয়ার এর এলাসিন ও আবাদপুর এ তৈরি হয় সবথেকে বেশি শাল।

টাঙ্গাইল এ এক কালার এর সামান্য বর্ডার দেয়া পাঁচহাত শাল আছে। নামে পাঁচ হাত হলেও আসলে শাল এর দৈর্ঘ্য আরো বেশি ।  এই শালগুলো ফুল কাভারেজ তো দেয় ই, অনেকেই জার্নিতে নিজেকে বাতাসের হাত থেকে রক্ষায় বা গায়ের উপর কাঁথার পরিবর্তে ব্যবহার করা যায় এসব শাল। নরমালি ছেলেদের শাল হলেও কিছু কালার ছেলেমেয়ে সবাই ব্যবহার করতে পারে।

টাঙ্গাইল এ মেশিনলুম এ ভিসকস সুতায় কিছু শাল তৈরি হয় যা এত মসৃণ এবং উন্নতমানের যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব কে কাশ্মিরি বলেই সেল করে। এতটা ই কোয়ালিফাইড যে বোঝার ও উপায় থাকেনা এগুলো দেশী নাকি কাশ্মিরি। অনেক অনেক বেশি সুন্দর এ শাল গুলোকে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন ক্রিয়েট করা হয় তাঁত এ ই যা শালগুলোকে অন্যরকম মাত্রা দেয়।

ভিসকস শাল এর উপর স্ক্রিনপ্রিন্ট , চুমকি পুঁথি, আড়ি সুতার  কাজ, ব্লক, কটকি প্রিন্ট এর কাজ হয়।  এমন কিছু করে শালগুলোকে অন্যরকম মাত্রা দেয়৷

বিদেশ থেকে আনা সুতা থেকেও টাঙ্গাইল এ শাল তৈরি হয় যা এত্ত সুন্দর যে ক্রেতাদের মনে উইশ জাগেই এসব সাল এর জন্য ৷ পাতলা হলেও অনেক উষ্ণতা দেয় শরীর কে।

টাঙ্গাইল এ হস্তচালীত তাঁত এ তৈরি হয় গ্রামীন চেক শাল। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে এই শাল গুলো ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া ও টাঙ্গাইল এর জামদানী শালতো আছেই।

বম আদিবাসীদের নিজস্বতা ধরে রাখলেও,  এখন পার্বত্য অঞ্চলের বাহিরে হচ্ছে তৈরি হচ্ছে বল শাল। টাঙ্গাইল এর বম শাল ইতিমধ্যে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে আলহামদুলিল্লাহ। কালার গুলো, কাজ গুলো খুব ই সুন্দর হয় শালের মধ্যে।

টাঙ্গাইল এ জরি সুতার এক ধরনের শাল তৈরি হয়। পুরো শাল এ এম্বুশ করার ফলে শাল এর সৌন্দর্য ও বেড়ে যায় এবং ভীষণ ভালো ও লাগে।। অত্যন্ত হালকা এ শাল কয়েকটা কালার এর কমবিনেশন কে একসাথে করে তাই খুব ভালো লাগে এটা ভেবে যে কয়েক ধরণের ড্রেস আপ এ শাল ব্যবহার করা হয়।

এছাড়া ও টাঙ্গাইল এ ছোট, বড়,  মাঝারি, চিকন,  পাতলা সব ধরনের শাল তৈরি করা হয়। কাস্টমার এর চাহিদা অনুযায়ী বাছাই করে নেয়ার সুযোগ আছে। এত ভ্যারিয়েশন যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়৷ গূনে মানে নিঃসন্দেহে সেরার তকমা ধরে রেখেছে টাঙ্গাইল এর শাল।

পাটের শালঃ

পাট আমাদের সোঁনালী আঁশ। পাটের ফাইবার দিয়ে এখন বিভিন্ন জেলাতে বিভিন্ন বস্ত্র তৈরি হয়৷ টাঙ্গাইল এর তাঁত এ ও পাটের সুতায় শাড়ি, থ্রিপিছ তৈরি হয়৷ তবে এসব ই শেষ না, পাটের সুতায় তৈরি হচ্ছে শাল ও। পাটের সুতার সাথে উল, রেয়ন ও পলিয়েস্টার এক্রাইলিক সুতার ও সামান্য ব্যবহার করা হয়। এতে অবশ্য পাটের পাকানো আঁশ বা পাটের আঁশ এর পরিমাণ বেশি থাকে৷ নানান ধরনের নকশা তৈরি করা হয় এ ধরনের শাল এ৷ লতাপাতা যে ডিজাইন টি অত্যন্ত পরিচিত এবং সকলের পছন্দের এই ডিজাইন টি ও পাটের শাল এ প্রাধান্য পায়৷

গর্ত তাতেই মূলত পাটের শাল তৈরি করা হয় এবং একেকটা শাল তৈরি করতে তাঁতীদের প্রায় ৭ থেকে ৮ দিন লেগে যায়৷ সময়স্বাপেক্ষ কিন্তু পরিবেশবান্ধব ও অত্যন্ত সুন্দর এ শালগুলো উঠে আসতেছে আমাদের ই-কমার্স এর হাত ধরে৷

মান্দি শালঃ

টাঙ্গাইল ওর মধুপুর এ রয়েছে গারো উপজাতিদের বাস। এখানে তারা তাঁত এ বিভিন্ন ধরনের পোশাক  তৈরি করে। পাশাপাশি তারা শাল ও তৈরি করে। গারো উপজাতি দের তৈরি এই শালগুলোকে মান্দি শাল বলা হয়৷ পাঁচ তাঁত এ এখানে প্রায় কর্মী আছে ৪০-৪৫ জন। প্রতি টানায় ১৮০ গজ করে কাপড় আসে যাতে করে ৭০ -৭৫ টি শাল। সেই হিসেবে দিনে ১-২ টা শাল তৈরি হয় তাদের দ্বারা। গারোদের সেল যদিও নিজেদের গোষ্ঠীর মাঝেই বেশি। তবে বিভিন্ন সেলার রা ও এসব শাল কিনে থাকেন।

মহেশখালীর রাখাইনদের শালঃ

মহেশখালীতে ৪ টি গ্রাম মিলিয়ে এখন প্রায় ৩৫০ টি রাখাইন জনগোষ্ঠী  পরিবার বাস করে। এরা কৃষিকাজ এর পাশাপাশি হস্তচালিত তাঁত এ কাপড় বুনে। এই কাপড়গুলো দেশে যেমন তাদের প্রয়োজন মেটায় তেমনি বিদেশে ও পাড়ি দেয়। যদিও তাঁত এর অবস্থা এখন খারাপ কিন্তু নিজেরাই সে তাঁত এ বিভিন্ন বস্ত্রের পাশাপাশি শাল ও বুনেন। রাখাইন দের নারীরা পুরুষদের সাথে সব ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করেন। তাঁত এর কাজ নারীকেন্দ্রিক ই। রাখাইন জনগোষ্ঠীদের এক সময় এমন অবস্থা ছিলো যে এ পরিবারের মেয়েদের আর কিছু না জানুক তাঁত বুনতে জানতেই হবে। এমন ও হতো যে তাঁত না বুনতে জানলে বিয়ে ভেঙ্গে যেত৷ দক্ষ তাঁতী দিনে ৫-৬ গজ কাপড় বুনতে পারেন,  কিন্তু এখন তাঁত এর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে, তবে তাদের এ পেশাকে বাঁচিয়ে রাখতে যথাযত ব্যবস্থা গ্রহন প্রয়োজন।

 লাউয়াছড়া’র উপজাতিদের শালঃ

মৌলভীবাজার এর শ্রীমঙ্গল এ সৌন্দর্য খেলা করে। চারপাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আখড়া। এখান থেকে দশ কিলোমিটার দূরত্ত্বে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বন। এখানেই বসবাস খাসিয়া ও মনিপুরী উপজাতির। মনিপুরী রা যেমন শাল বুনেন তেমনি খাসিয়া দের ও একটি ঐতিহ্য হচ্ছে কাপড় বোনা। এখানে তাঁত এ তারা ও বিভিন্ন বস্ত্রের পাশাপাশি শাল বুনেন। এদিকের এলাকাগুলোতে যেহেতু অনেক পর্যটক এর সমাগম তাই তাঁত এর এ পণ্যগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার অনেক।

মারমা দের তৈরি শাল (রাম্মা):

মারমা রা তাঁতশিল্পে বেশ পিছিয়ে আছে অন্যান্য উপজাতিদের থেকে কিন্তু একটা সময় তারাও ছিলেন তাঁত শিল্পের সাথে জড়িয়ে। তারা সুতা প্রস্তুত ও করতে নিজে এবং সুতা যে তুলা থেকে আসতো সেই তুলাও চাষ করতেন নিজেরাই৷  দিন বদলের সাথে তারা এ পেশা থেকে সরে এসেছে। তারপর ও নিজেদের পোশাকের জন্য তাঁত এ পোশাক না বুনলেও তাদের শাল অনেক চাহিদাসম্পন্ন, তাই তারা শাল এখনো বুনে থাকেন। তাদের শাল কে রাম্মা (মারমা ভাষা)বলে. শাল কম্বল বিক্রি করে তারা অনেকেই সংসারের ব্যয়ভার বহন করে। বাহির থেকে যারা ঘুরতে যান মারমা দের বোনা শাল খুব পছন্দ করেন তারা এবং আসার সময় শাল কিনতে ভুলেন না।

ভেলভেট, মখমল, উল বা ভিসকস এসব শাল এর সাথে বিভিন্ন ইনোভেশন এনে শালগুলোকে এত ভিন্নতা দেয়া হচ্ছে যা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহের জায়গায় পরিণত হচ্ছে। এমনকি উল এর ও বিভিন্ন ধরনের শাল থেকে এখন কোটি, পঞ্চ এসব তৈরি করা হচ্ছে, গ্রাহক রা নিজেদের কমফোর্ট এর জায়গা থেকে বেছে নিচ্ছেন শাল বা শাল এর বিভিন্ন ইনোভেটিভ পণ্যকে।

আমাদের গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক নারী রা যারা কুরুশের কাজ করে। কুরুশের শালগুলো আমাদের দেশের থেকেও বেশি জনপ্রিয় বাহিরের দেশে। ফ্যাশনের ই একটি অংশ এ শাল গুলো জিন্স, টপ্স, শাড়ি, সালোয়ার কামিজ সবকিছুর সাথে বেছে নিচ্ছেন ফ্যাশন সচেতন নারীরা৷ এসব শাল তৈরি অনেক কষ্টসাধ্য, সময়ের ও প্রয়োজন হয় অনেক৷  শুধুমাত্র সুতা ও হাতের কারুকাজ এ কুরুশের শালগুলো তৈরি হয় যা কাস্টমাইজ করার সুযোগ থাকে কারণ যাএয়া এ কাজে দক্ষ তারা যেকোন ডিজাইন দেখলেই তা তুলতে পারেন এবং সুতার রং ও পছন্দমত ই বাছাই করেন সাথে সাইজ ও৷  কুরুশের পঞ্চ শালগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এর সাথে সাথে উলের শাল এর পাড়েও কুরুশের কাজ করে শালকে ভিন্নতা দিতে দেখা যায়৷

এসব ছাড়া ও অসংখ্য অসংখ্য শাল আছে আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে, মূলত সেসব সম্পর্কে আগে আমাদের অবগত হওয়া প্রয়োজন। তারপরেই নেয়া যাবে পরবর্তী পদক্ষেপ। শাল তৈরির পর্যাপ্ত রিসোর্স আমাদের আছে কিন্তু সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা, সরকারী বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং সরকারি ভাবে শীত প্রধান দেশে শাল রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহন করলে অবশ্যই শাল রপ্তানি বাড়বে সাথে বাড়াবে তাঁতীরা তাদের প্রোডাকশন ও। তুলে ধরতে হবে আমাদের শাল এর সম্ভাবনা নিয়ে, বিভিন্ন শাল নিয়ে তবেই সম্ভব আস্তে ধীরে দেশীয় শাল এর অবস্থার  পরিবর্তন। 

শাল আমাদের গর্বের জায়গা,  অনেক উন্নত আমাদের দেশীয় শাল তাই এই সেকটর টি কে  গুরুত্ত্বের সাথেই নিতে হবে সারাবছর ধরেই। ই-কমার্স এর মাধ্যমে দ্রুতগতিতে শাল এর প্রচারণা সম্ভব তবে ডেডিকেটেড মানুষ প্রয়োজন  এ সেকটরে কাজ করার জন্য তাহলে এক সময় শাল সেকটর মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, যদিও বিগত বছরগুলোর তুলনায় এখন দেশীয় শালের কদর বেশি এবং প্রচারণা ও। সবই সম্ভব হয়েছে উদ্যাক্তাদের এগিয়ে আসার জন্য,  রাজিব আহমেদ স্যার এর শক্তভাবে হাল ধরার জন্য যেমন উঠে এসেছে অনেক দেশীয় পণ্য তেমনি এ বছর শাল এর ও ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে, সামনের বছরগুলোতে তা আরো বাড়বে ইন শা আল্লাহ।

লেখিকাঃ

1 thought on “দেশীয় শাল আমাদের ঐতিহ্যের অংশ”

Write your comment

Scroll to Top