
বর্তমানে জিআই পণ্য নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হওয়ার কারণে এ ব্যাপারে অনেকের মাঝে আগ্রহ বেড়ছে। স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও জিআই পণ্যের সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। যার ফলে সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কি কি বৈশিষ্ট্য থাকলে একটা পণ্যকে সম্ভাব্য জিআই পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে তা নিয়ে আলোচনা করবো।
সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করার উপায়
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ এবং ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বিধিমালা, ২০১৫-তে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেতে পারে এমন ৩টি ক্যাটাগরির কথা উল্লেখ করেছে। এগুলোর মাঝে অসংখ্য সাব-ক্যাটাগরি করে সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। প্রধান ক্যাটাগরিগুলো–
(১) কৃষিজাত পণ্য
জিআই আইন ২০১৩-তে প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে কৃষিজাত পণ্যের কথা। যেই পণ্যগুলো কৃষি বা কৃষিজাত পণ্য তা অন্য সকল শর্ত পূরণ করে জিআই স্বীকৃতি অর্জন করতে পারবে। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে আরও অনেকগুলো ক্যাটাগরি করার সুযোগ রয়েছে। যেমন:
ফল: দেশে নানা ধরণের ফল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে কিছু ফল ইতিমধ্যে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। যেমন: আম ও কলা।
মৎস্য: মৎসের আলাদা অধিদপ্তর থাকলেও কৃষি পণ্যের অধীনে রাখার সুযোগ রয়েছে। ইলিশ ও চিংড়ি ইতিমধ্যে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রাণি সম্পদ: যেহেতু আইনে প্রাণি সম্পদের কথা আলাদা করে উল্লেখ করা নেই তাই এটিকেও কৃষির অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া প্রাণি সম্পদের মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের কথা উল্লেখ করা যায়।
উদ্ভিদ/বনজ: উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্যগুলো জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে। ইতিমধ্যে আগরের জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি সরাসরি গাছ থেকে পাওয়া যায়। এছাড়াও কাঠ, ফল কিংবা যেকোন ধরনের গাছের জিআই স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করা যেতে পারে। বা গাছ থেকে তৈরি পণ্য যেমন: ফার্নিচার।
খদ্য: বর্তমানে আমাদের দেশে যতগুলো জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে এর মধ্যে খাদ্যের অবস্থান শক্তিশালী। যেমন: কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের চমচম, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, গোপালগঞ্জের রসগোল্লা উল্লেখযোগ্য।

প্রকৃতিজাত পণ্য:
আমরা প্রকৃতি থেকে যেসব পণ্য পেয়ে থাকি বা আহরণ করি তা অন্য সকল শর্ত পূরণ করার মাধ্যমে জিআই স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে। যেমন: পাথর, মাটি, মধু ইত্যাদি।

হস্তশিল্পজাত বা শিল্পজাত:
হস্তশিল্প বললেই নকশিকাঁথা কিংবা নকশি পণ্যের কথা মথায় আসে। এ ছাড়াও বহুরকমের হস্ত পণ্য রয়েছে। অর্থাৎ হাতের সাহায্যে যত পণ্য উৎপাদন করা হয় তাই হস্তশিল্প। যেমন: হাতপাখা, শীতলপাটি, গয়না, বাঁশ বেতের তৈরি পণ্য (ঢোলা, কুলা, ইত্যাদি)। আধুনিক সমাজে হ্যান্ড ক্রাফট পণ্য বেশ জনপ্রিয়, এগুলোও হস্ত পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শিল্পজাত পণ্যগুলোও জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে। অর্থাৎ শিল্পকারখানায় যেসব পণ্য উৎপাদন হয়। যেমন, সম্প্রতি মৌলভীবাজারের আগর আতর জিআই পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একটা করে শিল্পকারখানা রয়েছে (আগরকে কেন্দ্র করে)। কুষ্টিয়ার তিলের খাজাও কারখানায় উৎপাদন হয়। এ বছরের শুরুতে এটিও জিআই পণ্যের মর্যাদা লাভ করেছে।
এতক্ষণ আইন অনুযায়ী পণ্যগুলোর ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই এসব ক্যাটাগরির সব পণ্যই সম্ভাব্য জিআই পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করার জন্য আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।
- এটি দেশের অভ্যান্তরে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সাথে উৎপাদন হতে হবে। অর্থাৎ সমজাতীয় পণ্য অন্য কোথাও উৎপাদন হলেও এটির সাথে বৈশিষ্ট্য তথা স্বাদ, আকৃতি কিংবা অন্যান্য স্বাতন্ত্রতা থাকবে।
- থাকতে হবে দীর্ঘ দিনের ইতিহাস। সাধারণত ৫০ বছরের একটি মাপকাঠি রয়েছে।
- স্থানীয়ভাবে এটির সুনাম ও পরিচিতি থাকতে হবে।
- বাণিজ্যের গুরুত্ব থাকা আবশ্যক।
- জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর ব্যবসা সম্প্রসারের সম্ভাবনাও থাকা চাই।
- উৎপাদন, সংরক্ষণ কিংবা বাজারজাতকরণে বেশি মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকতে হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট একটি দোকান বা কোম্পানীর বিখ্যাত পণ্য হলে হবে না।
- মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকা দরকার।
- ঐতিহাসিক দলীল থাকা চাই। তা বই কিংবা প্রমাণ করা যায় এমন যেকোন রেফারেন্স।

কোন পণ্যের এই বৈশিষ্টগুলো উপস্থিত থাকলে সেই পণ্যটি সম্ভাব্য জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারে। জিআই পণ্যের আবেদন করার পূর্বে এই তথ্যগুলো একটি সঠিক পণ্য খুঁজে বের করতে সহায়ক হবে। আশাকরি সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জেনিস ফারজানা তানিয়া ওয়েবসাইটে সারাদেশের সম্ভাব্য জিআই পণ্যের তালিকা ও বর্ণনা রয়েছে। এখানে ঢুঁ দিয়ে কিছু সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করা যেতে পারে। এসব পণ্য ছাড়াও আপনার চারপাশে থাকা পণ্যগুলোতে উপরের শর্তগুলো খুঁজে পেলে জিআই নিয়ে চিন্তা করতে পারেন।
সম্ভাব্য জিআই পণ্য চিহ্নিত করার উপায় নিয়ে আর কোন প্রশ্ন আছে?
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, আওয়ার শেরপুর।




আমাদের চারপাশে সম্ভাবনাময় অনেক পণ্য রয়েছে জিআই স্বীকৃতি অর্জনের মতো।
যথার্থ বলেছেন। ধন্যবাদ
মুন্সিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি কি জি আই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে?
জিআই এর শর্তগুলো পূরণ করে ডকুমেন্টেশন তৈরি করা গেলে এবং আবেদন করা হলে জিআই স্বীকৃতি পেতে পারে।